A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
Home / আইন ও অপরাধ / মনে আছে এরশাদ শিকদারের কথা? পৈশাচিক কায়দায় মানুষ খুন করা ছিল যার শখ! বিস্তারিত!!

মনে আছে এরশাদ শিকদারের কথা? পৈশাচিক কায়দায় মানুষ খুন করা ছিল যার শখ! বিস্তারিত!!

Loading...

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলা। তার মাঝে ছোট্ট একটা গ্রাম মাদারঘোনা। এই গ্রামেই জন্ম নিয়েছিল এমন একজন যে কিনা পরিণত বয়সে ধারণ করেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের বর্বরতম খুনীর তকমা। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত মানুষের পাঁজরের উপরে উন্মাদ নৃত্য করা ছিল যার প্রিয় শখ। রক্তের ফিনকিতে জিঘাংসা মিটিয়ে একেকটা খুনের পর দুধ দিয়ে গোসল করা ছিল যার রেওয়াজ। নাম তার এরশাদ। এরশাদ শিকদার।

মাদারঘোনা গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক বন্দে আলী মিঞার ছোট ছেলে এই এরশাদ। তার ছেলেবেলাটা জীবন বাস্তবতার বেশ কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই কেটেছিল বলা যায়। নিজের জমি ছিল না বন্দে আলীর, ছোটখাটো ব্যবসা আর খুচরো কাজ করে সংসার চলত কোনো রকম। এরশাদের বয়স যখন বারো কি তেরো, তখন কঠিন এক অসুখে পড়ে মারা যায় বন্দে আলী।

অভাবের সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করল মা, বাড়ি বাড়ি কাজ করতে লাগল। এদিকে এরশাদ ব্যস্ত এলাকায় ডানপিটেমো করতে। স্কুল পালানো তো বটেই, এর ওর সাথে মারপিট, এটা সেটা চুরি- এই করেই তার সময় কাটছে তখন আর প্রতিদিন মায়ের কাছে তার নামে নালিশ আসছে। এর মাঝেই একদিন এরশাদ এক ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হল।

১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে এরশাদরা খুলনার ঘাট এলাকায় চলে এল, সে-মা-আর বড় ভাই। মা এলাকার বাসায় বাসায় কাজ করতে লাগল, বড় ভাই হল ঘাটের কুলি, আর এরশাদ হল ঘাটের কুলিদের নেতা কাশেম সরদারের সহযোগী। এবারে সে পুরোদমে শুরু করল ছিঁচকে চুরি। প্রায়ই সে ধরা পড়ত চুরি করতে গিয়ে। গায়ের রং ফরসা হওয়ায় অনেকেই তাকে ডাকত রাঙ্গাচোরা, কেউ কেউ ডাকত ধলাচোরা বলেও।

 

 

 

 

 

 

 

 

ট্রলার থেকে মাছ আর গম চুরি, জাহাজ থেকে তেল চুরি এসব করেই অপরাধের অন্ধকার জীবনে হাত পাকাতে লাগল এরশাদ। এর মধ্যে কাশেম সরদারের জায়গায় এল আঞ্জু সরদার। দ্রুতই আঞ্জু সরদারের কাছের লোক হয়ে উঠল সে। হঠাৎ একদিন ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটল। আঞ্জু শিকদারের সমকামিতার শিকার হল এরশাদ।

১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে এরশাদের নতুন সঙ্গী হল একটা রামদা। এই রামদা নিয়ে ঘাট এলাকায় সে শুরু করল ডাকাতি আর ছিনতাই। বেশ কিছু সঙ্গীও জুটল এ সময়। এরশাদের কাজের মাত্রা হয়ে উঠল আরও ভয়ানক। পাঁচ জন চেলা-চামুণ্ডা সাথে নিয়ে সে একটা দল তৈরি করল। এই দলের সদস্যদের কাজ ছিল বার্জ-কার্গো থেকে পণ্য চুরি করে নদীতে লাফিয়ে পড়া। সময়ের সাথে সাথে গ্রুপের সদস্য বাড়তে লাগল, বাড়তে থাকল অপরাধের মাত্রাও। রেললাইনের স্লিপার চুরি, কাঠ চুরি, রেলের ওয়াগন ভাঙা এসব চলতে লাগল পুরোদমে। ট্রলারে চাঁদাবাজিও শুরু হল। গমের বস্তা পাচার আর সিমেন্টের বস্তা খুলে বালি মেশানোও চলতে লাগল। আর ঘাট এলাকায় চাঁদাবাজি তো ছিলই।

 

 

 

 

 

 

 

১৯৮২ সাল। সামরিক স্বৈরাচারি সরকার এল ক্ষমতায়। তখন খুলনার সিটি মেয়র হল কাজী আমিন। আর তখনকার উঠতি গুণ্ডা সর্দার এরশাদ হয়ে উঠল কাজী আমিনের কাছের লোক। তার চাঁদাবাজি-মাস্তানি করার শক্তি বেড়ে গেল অনেক গুণ। এক সময় যার সহযোগী ছিল এরশাদ, সেই কাশেম সরদারকে হটিয়ে দিল সে। ক্ষমতার পরিধি আরও বড় হল। খুলনার চার-পাঁচ নাম্বার ঘাট এলাকা, রেলওয়ে কলোনি আর আশেপাশের মার্কেটগুলোতে একক অধিপতি হয়ে উঠল সে।
এরপর শুরু হল দখলের পালা। ১৯৮৪ থেকে ’৮৬ এই সময়টা জুড়ে এরশাদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত হল দখলের মধ্য দিয়ে। রেলওয়ের মার্কেট করায়ত্ত করল সে। রেলওয়ের জায়গা দখল করে নতুন মার্কেটও তৈরি করল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভয়ঙ্করতম এক ব্যবসা মাদক, এরশাদের নজর পড়ল সেখানেও। খুলনায় মদ-গাঁজা-হেরোইন-ফেনসিডিলের ব্যবসায় হাত পড়ল তার।

১৯৮৮ সাল। এরশাদ শিকদারের অপরাধ জগতে যুক্ত হল প্রশাসনিক ক্ষমতা। সেবারে ভোটারবিহীন নির্বাচনে খুলনার তৎকালীন ২১ নাম্বার, বর্তমানে ৮ নাম্বার ওয়ার্ডের কমিশনার হল এরশাদ। আরও ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল তার সাম্রাজ্য। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক, বাংলাদেশ বিমান আর বাংলাদেশ রেলওয়ের জায়গা দখল করে গড়ে তুলল বস্তি। বস্তি জুড়ে ছোট ছোট ঘর। কুলি-রিকশাওয়ালা-দোকানী-হোটেল কর্মচারী-ওয়ার্কশপ মেকানিক এমন নানান পেশার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ বস্তিতে থাকা শুরু করল এক সময়। এদের মধ্যে অনেকেই যুক্ত হয়ে পড়ল এরশাদ শিকদারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে।

 

 

 

 

 

 

 

এভাবে এরশাদ হয়ে উঠতে লাগল দক্ষিণাঞ্চলের অপরাধ জগতের একচ্ছত্র অধিপতি। একই সাথে পরিণত হতে লাগল রক্তপিপাসু এক ভয়ংকর দানবে। মানুষের রক্ত নিয়ে পাষাণ ক্রীড়ায় মত্ত হয়ে ওঠার দিনগুলো শুরু হল তার। সে সময় তার অবৈধ ব্যবসার বিরোধিতা করার চেষ্টা করত কেউ কেউ। কিন্তু বিরোধীতা সহ্য করার লোক তো সে নয়। এর জন্য শাস্তি নির্ধারিত হত একটাই, এরশাদের হাতে পৈশাচিক কায়দায় খুন হয়ে যাওয়া। এ নিয়ে বলতে গেলে ইনসাফ, কামাল ও খালেক নামের তিন নৈশপ্রহরীর কথা আসবে শুরুতেই। একবার তারা এরশাদের চোরাচালানের কিছু মালামাল ধরিয়ে দিয়েছিল পুলিশের হাতে। এত বড় আস্পর্ধা! ভয়ানক ক্ষিপ্ত হল এরশাদ। এই তিনজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হল এলাকার প্রভাতী স্কুলের পেছনে। এরপর একেকজনকে মাটিতে ফেলে বুকের উপর লাফাতে লাগল এরশাদ। অবিরাম আঘাতে পাঁজর ভেঙে দেয়া হল তাদের। তারপর গলায় নাইলনের দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হল একে একে। এদিকে, সেই খুনের দৃশ্য দেখে ফেলে শাহজাহান নামের একজন। এর শাস্তিও ঐ একটাই। তাকেও ঘাট এলাকায় নিয়ে নৃশংসভাবে খুন করা হল।

একবার তার মাদক ব্যবসায় বাধা দিতে চেয়েছিল নান্টু। এই অপরাধে প্রথমে তাকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তারপর আবার লোক পাঠানো হয় হাসপাতালে। তারা বিষাক্ত ইনজেকশন শরীরে ঢুকিয়ে খুন করে নান্টুকে। এরশাদের সাথে ব্যবসা করে তা থেকে ছুটে বা ফিরে আসারও কোনো উপায় ছিল না। একবার এরশাদের সহযোগী ছয় ব্যবসায়ী তার সাথে আর ব্যবসা করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এত বড় অপরাধ! শাস্তি দেয়া হল নারকীয় নাটকীয়তায়। একদিন তাদের দাওয়াত দিল এরশাদ। সারা দিন নানান খাবার দিয়ে ভরপেট আপ্যায়ন করা হল তাদেরকে। তারা জানত না সবশেষে কী আতিথেয়তা অপেক্ষা করছে। নিদারুণ নির্মমতায় একে একে ছয়জনকেই নিজস্ব বর্বর কায়দায় খুন করল এরশাদ। ছয়টা লাশ ডুবিয়ে দেয়া হয় ভৈরব নদীতে।

১৯৯১ সাল। সামরিক সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় তখন বিএনপি। এতদিনের ভোল পাল্টে ফেললো এরশাদ। বিএনপিতে যোগ দিল সে। এবারে এরশাদ শিকদারের সম্পত্তির তালিকায় যুক্ত হল একটা বরফকল। এই বরফকলটাই পরবর্তীতে হয়ে উঠে বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। ঘাট এলাকার একমাত্র এই বরফকলের মালিক ছিল রফিক। তাকে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিয়ে সেটা দখল করে নিয়েছিল এরশাদ। ঘাটের প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে এই কল থেকে বরফ নেয়ার জন্য বাধ্য করা হত। বরফকলটা পরিণত হয়েছিল রক্ত হিম করা পৈশাচিক এক আতঙ্কের নামে। কারণ এরশাদ শিকদার এখানে চালাত রক্ত মাংসে গড়া একেকটা মানুষের শরীর নিয়ে পৈশাচিকতম বর্বরতা। কী বন্ধু, কী শত্রু, এরশাদ শিকদারের রক্তের লোভ ছাড়েনি কাউকেই। একের পর এক মানুষ খুনের কারখানা এই বরফকলে একটা এয়ার কন্ডিশনড রুম ছিল। এই রুমে এরশাদ শিকদার আয়োজন করত মদ-জুয়ার আসরের। আর সে আসরে নিয়মিত যোগ দিত স্থানীয় প্রশাসন-পুলিশ-রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, শোনা যায় বাংলা চলচ্চিত্রের এক নামকরা ভিলেনও উপস্থিত থাকত সেখানে। মদ জুয়ার আসর শুধু নয়, বিলাসবহুল প্রমোদ বিহারের আয়োজনও করা হত এদেরকে নিয়ে। এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষমতাশীল লোকদের নিজের পকেটে পুরতে লাগল এরশাদ শিকদার। নরপিশাচ হয়ে ওঠার রাস্তাটা আরো মসৃণ হতে লাগল।
এরশাদ তখন তৎকালীন ২১ নাম্বার ওয়ার্ডের কমিশনার। তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী পার্শ্ববর্তী ১৫ নাম্বার ওয়ার্ডের কমিশনার আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম উদ্দিন খান। প্রতিপক্ষ গ্রুপ একবার মামলা করল এরশাদ আর তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। কোনো এক কারণে মামলার আসামীর তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় এরশাদের দলের টাক আজিজ নামের একজন। সন্দেহ হল এরশাদের। কেন তার নামে মামলা হল না, সে নিশ্চয়ই অন্য গ্রুপকে সহায়তা করে! এরপর কেবল সন্দেহ মেটানোর জন্যই এরশাদ খুন করল টাক আজিজকে।

তখন চার আর পাঁচ নাম্বার ঘাট ছিল এরশাদের নিয়ন্ত্রণে, ওদিকে সাত নাম্বার ঘাট আর রুজভেল্ট জেটি ছিল মোসলেমের নিয়ন্ত্রণে। এই দুই সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে ঘাট এলাকা জুড়ে চলত কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি, আর সাথে মাদক ব্যবসা। এরশাদের সরাসরি বিরোধীতা করে ঘাট এলাকায় বেঁচে থাকা তখন প্রায় অসম্ভব। মোসলেমও পারল না। ’৯৩ সালের রোজার সময় মোসলেমের উপর গুলি আর বোমা নিয়ে হামলা করল এরশাদের বাহিনী। খুন হল মোসলেম। আর এরপরই পুরো ঘাট এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে গেল এরশাদের হাতে।

এক খুনের সুতোয় আরেক খুনের মালা গাঁথা হতে লাগল তারপর। মোসলেম খুনের দায়ে মামলা হল এরশাদের নামে। সে মামলার বাদীকে ফাঁসাতে আরেক খুনের আশ্রয় নিল এরশাদ। এবারের শিকার জয়নাল। অথচ এই জয়নাল ছিল তারই ঘনিষ্ট সহযোগী। জয়নালকে খুন করার পর সেই খুনের জন্য এবার একটা মামলা করা হল। আর এই মামলার আসামী করা হল মোসলেম হত্যা মামলার বাদী বাবুলকে।

হাসতে হাসতে নির্মম পৈশাচিক অত্যাচার করা হয়ে দাঁড়ালো এরশাদ শিকদারের কাছে ডালভাত ব্যাপার। বরফকল ছাড়াও খুলনা শহরের বিভিন্ন জায়গায় কতগুলো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানিয়েছিল সে। রেলওয়ে এলাকার পুরাতন পানির টাংকি, বরফকলের পেছনে পরিত্যক্ত মঠ এসব জায়গায় ক্যাম্প ছিল। ক্যাম্পগুলোর কোনোটাতে মানুষ মারা হত ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে, কোনটায় গুলি করে।

জেমস বন্ড সিনেমার ব্লোফেল্ডের মানুষখেকো পিরানহা মাছের সেই ভয়ঙ্কর পুলের মত এরশাদ শিকদার তার বস্তির ভেতরে বানিয়েছিল ১০ থেকে ১২ হাত গভীর একটা হাউজ। ওই হাউজে চাষ হত রাক্ষুসে আফ্রিকান মাগুর। পৈশাচিক কায়দায় মানুষ খুনের পর লাশ ফেলে দেয়া হত এই হাউজে। একেকটা রক্ত মাংসের মানুষের শরীর হয়ে উঠত রাক্ষুসে মাগুরের খাবার।

এরশাদের এইসব আস্তানা আর ক্যাম্প বানানোর জন্য যত জমি দরকার হত তার কেনাবেচার দালালি করত ঢাকাইয়া আজিজ। এই কাজটাই তার জন্য কাল হয়েছিল। তার অপরাধ ছিল, দালালির সুবাদে সে এরশাদের নানান জায়গার সম্পত্তির বিবরণ জানত। এরপর এরশাদের হাতে লাশ হয়ে ভৈরব নদীতে ডুবে সেই অপরাধের শাস্তি পেতে হয় ঢাকাইয়া আজিজকে।
খুলনার বড়বাজার এলাকায় সুদের ব্যবসাও শুরু করেছিল এরশাদ। জামানত ছাড়াই তার কাছ থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীরা ঋণ নিত। চড়া সুদে এসব ঋণ দিয়ে রীতিমত একটা ব্যাংক ব্যবসা চালু করেছিল সে। ১৯৯৫ সালের দিকে এরশাদের সম্পত্তির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল। সে সময় তার টাকা পয়সার হিসেব রাখত জাহাঙ্গীর। সে আবার এরশাদ শিকদারের ছেলেমেয়েদের পড়াত। এ জন্য তার নাম হয়েছিল মাস্টার জাহাঙ্গীর। গল্প আছে, সে নাকি এরশাদ শিকদারের স্ত্রী খোদেজার সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিল। এদিকে এরশাদের ১০০ কোটি টাকার সম্পদের কথাও সে তার এক বন্ধুকে বলে ফেলেছিল। এ সব কিছুই জানতে পারে এরশাদ। ফলাফল- তাকে নিয়ে আসা হল বরফকলে। বরফ ভাঙার মুগুর দিয়ে ভাঙা হল তার হাত-পা। এরপর বুকের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে ভাঙা হল তার পাঁজর। সবশেষে শ্বাসরোধ করে খুন করা হল মাস্টার জাহাঙ্গীরকে।

১৯৯৬ সালে আবার ক্ষমতায় এল আওয়ামি লীগ। আবারও ভোল পাল্টানোর সময় হল এরশাদের। ১৯৯৭ সালে, যখন আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম উদ্দিন খান হত্যার প্রধান আসামী এরশাদ, যখন পুলিশের রেকর্ডে তার নামে ত্রিশটি মামলা রয়েছে, যখন তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুলিশ পুরস্কার ঘোষণা করেছে, সে অবস্থাতেই, খুলনা সার্কিট হাউসে পুলিশের সামনে আওয়ামী লীগ নেতাদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে দলে যোগ দিল এরশাদ। এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে বিতর্ক শুরু হওয়ায় ‘৯৮ সালে তাকে বহিস্কার করা হল আওয়ামী লীগ থেকে।

এরশাদের স্ত্রীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে কিংবা কেবল সন্দেহের অবসান ঘটাতেই মাস্টার জাহাঙ্গীর ছাড়াও খুন হতে হয়েছে আরো অনেককে। এমনই এক শিকার এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির ফটিক। ফটিক জানত না কত অবলীলায় মৃত্যুর সাথে সখ্যতা করেছিল সে। এরশাদের পরিবারের সাথে খাতির ছিল তার। নিয়মিত আড্ডা দিতে যেত তাদের বাড়িতে। এর মাঝেই খোদেজার সাথে হয়ত কোনো সম্পর্ক হয়েছে ফটিকের, এমন সন্দেহ হয় এরশাদের। এরশাদ শিকদারের সন্দেহ! শাস্তি সেই একটাই। সেই সন্দেহ দূর করতে পৈশাচিকভাবে খুন হয়ে যেতে হয় এডভোকেট ফটিককে।

আকিমুলের খুনের ঘটনাটিকে হয়ত প্রকৃতির নির্মম রসিকতাও বলা যায়। ঝিনাইদহের টেলিফোন অপারেটর ছিল আকিমুল। এক রাতে টেলিফোনের ডায়াল ঘোরাতে ঘোরাতে দৈবক্রমে সে ফোন করে ফেলে এরশাদের বাসায়। বুঝতে পারে নি সে, নিজের অজান্তে মৃত্যুদূতকেই ফোন দিয়েছিল। এরপর এরশাদের স্ত্রী খোদেজার সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ল আকিমুল। এমনকি তাকে নিয়ে পালানোর পরিকল্পনাও করেছিল। জেনে ফেলে এরশাদ। বেজে গেল মরণঘণ্টা। পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে দুজনই। খোদেজাকে বাড়ি পাঠিয়ে আকিমুলকে নিয়ে আসা হল বরফকলে। সে দিনই জমাট সিমেন্টের বস্তার সাথে বাঁধা অবস্থায় আকিমুলের স্থান হল ভৈরব নদীর তলায়।

আপাদমস্তক মানুষবেশী এই দানব এরশাদ শিকদার এমন খেলাচ্ছলেই খুন করতে করতে কেড়ে নিয়েছিল ষাটজন মানুষের জীবন, এ সংখ্যা শুধু পুলিশের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী। আরও কত প্রাণ প্রদীপ সে নিভিয়ে দিয়েছিল শুধু তার রক্তের নেশা মেটাতে গিয়ে, কে জানে! পরবর্তী পর্বে থাকছে এই অমানবিকতার পরিসমাপ্তির বর্ণনা, জানবেন কীভাবে সাঙ্গ হয়েছিল এই পিশাচের ভবলীলা।

Check Also

যে শহরের দেয়াল ধরে কাঁদতে আসেন মানুষ!

Loading... বিশ্বে তিন ধর্মালম্বী মানুষের কাছে পবিত্র ভূমি জেরুজালেম। এই শহরে এমন একটি বিশেষ দেয়াল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *